জিসিসি অঞ্চলে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে বিনিয়োগ ২ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে

বৈশ্বিক আর্থিক খাতে দিন দিন আরো শক্তিশালী হচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর অবস্থান।

বৈশ্বিক আর্থিক খাতে দিন দিন আরো শক্তিশালী হচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর অবস্থান। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পুঁজি স্থানান্তর হয়ে প্রবেশ করছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর আর্থিক খাতে। নানা জায়গা থেকে এসে জড়ো হওয়া এ পুঁজি সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে বিনিয়োগ হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন তহবিলে। ক্রমেই ফুলেফেঁপে উঠছে অঞ্চলটির আর্থিক সম্পদ খাত। পরামর্শক সংস্থা বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের (বিসিজি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অঞ্চলটিতে অ্যাসেটস আন্ডার ম্যানেজমেন্ট (এইউএম) বা সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত সম্পদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ শতাংশ। এ সময় জিসিসি অঞ্চলে এ ধরনের সম্পদের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে।

জ্বালানি তেলবহির্ভূত খাতে অর্থনীতি সম্প্রসারণ ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত নিয়ন্ত্রণের উদারীকরণ ও সহজীকরণের সুবাদে গত অর্ধ দশকে এ অঞ্চলের আর্থিক খাত ব্যাপক মাত্রায় সম্প্রসারণ হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়েছে এ অঞ্চলের দেশগুলোর বিনিয়োগ তহবিল বা মিউচুয়াল ফান্ড, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও পেনশন ফান্ড। বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত নিয়ে বিসিজির ‘ফ্রম রিকভারি টু রিইনভেনশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এ খাতে জিসিসি অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরব। দেশ দুটিতে এ খাতে মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে রিটেইল মিউচুয়াল ফান্ড। অন্যদিকে সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রাধান্য ছিল কুয়েত ও আবুধাবিতে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বভৌম তহবিলের স্থিতিশীলতা, খুচরা বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধির ধারা ও কৌশলগত বহুমুখীকরণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে জিসিসি সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সামলে অঞ্চলটি বিশ্বসেরা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।

বিসিজির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জিসিসি অঞ্চলে রিটেইল মিউচুয়াল ফান্ডের প্রবৃদ্ধি ছিল খাতটির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে এক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহের চেয়ে বাজার পারফরম্যান্স ও বিদ্যমান বিনিয়োগে মূল্য সংযোজনের প্রভাব পড়েছে তুলনামূলক বেশি। নিজস্ব কার্যক্রমের চেয়ে খাতটির প্রবৃদ্ধি বেশি নির্ভরশীল থাকে বাইরের বাজার পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি বা বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর। চলমান ফি কমার চাপ, বিনিয়োগকারীদের পছন্দে পরিবর্তন ও ডিজিটাল বিপ্লব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসার মডেল পুনর্গঠন, ব্যয় দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং কৌশলগত মনোযোগ আরো বিন্যস্ত করতে বাধ্য করছে। জিসিসি অঞ্চলের আর্থিক খাতে পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন পণ্য বিকাশের সুযোগ বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), মডেল পোর্টফোলিও ও আলাদাভাবে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট। ব্যক্তিগত সম্পদের প্রতি রিটেইলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও অনেক বাড়ছে। সেমি-লিকুইড প্রাইভেট ফান্ড মাত্র চার বছরে পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে ৩০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

বিসিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অংশীদার ও ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন বিভাগের মধ্যপ্রাচ্য প্রধান লুকাস রে বলেন, ‘২০২৪ সালে জিসিসিতে এইউএম সম্পদে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাতিষ্ঠানিক ও রিটেইল মূলধনের কেন্দ্র হিসেবে অঞ্চলটির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রমাণ করছে। জিসিসির কৌশলগত বহুমুখীকরণ ও সার্বভৌম তহবিলের আধিপত্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এখানকার স্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো সামনের দিনগুলোয় বৈশ্বিক জায়ান্টদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।’

সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের মতে, জিসিসি অঞ্চলের আর্থিক খাতে গতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করেছে প্রধানত সৌদি আরব ও ইউএই। এর মধ্যে ইউএইতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের সম্প্রসারণ হয়েছে মূলত দুবাইকেন্দ্রিক। গত কয়েক বছরে বিশ্বের আর্থিক খাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে শহরটি। অন্যান্য দেশ থেকে বিভিন্ন শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে দুবাইয়ে। এক্সচেঞ্জ হাউজ, হাওলা নেটওয়ার্ক ও ট্রেডিং কোম্পানির হাত ঘুরে আসা বেনামি এসব অর্থ যুক্ত হচ্ছে দুবাইয়ের অর্থনীতিতে। পাচারকৃত অবৈধ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে দেশটির রিয়েল এস্টেট, মূল্যবান ধাতু ও আর্থিক সম্পদের বাজারে। মার্কিন বিধিনিষেধের আওতায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনকারীরা দুবাইকে ব্যবহার করছেন ‘ফাইন্যান্সিয়াল ওয়ে স্টেশন’ হিসেবে। ইউএইর আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিটি গড়ে উঠেছে বড় ব্যাংক, এক্সচেঞ্জ হাউজ ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানই এখন অর্থ পাচারের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ারভিত্তিক এএমএল ওয়াচারের এক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটিতে অর্থপাচার প্রতিরোধে বেশকিছু আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও দেশটিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাওয়া ঠেকাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে। সৌদি আরবের দ্রুত বর্ধনশীল আর্থিক খাতেও এখন এ ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) চাপে ইউএই, সৌদি আরব ও কাতার অ্যান্টি মানি-লন্ডারিং (এএমএল) আইন শক্ত করেছে। কিন্তু প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ও ফ্রি-জোন কোম্পানির ক্ষেত্রে ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এসব দেশে সম্প্রতি কয়েকটি মামলায় অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দণ্ড দেয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামগ্রিক আর্থিক অপরাধ দমনে তা যথেষ্ট নয়। মূলত বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ আইন এবং নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে দণ্ড দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল মামলাগুলোর একটি ছিল দুবাইয়ে। যেখানে ভারতীয় ব্যবসায়ী আবু সাবাহকে অপরাধ চক্রের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। বড় অংকের জরিমানার পাশাপাশি ১৫ কোটি আমিরাতি দিরহামের সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন আদালত।

তবে অর্থ পাচার নজরদারি সংস্থা এএমএল নেটওয়ার্কের দেয়া তথ্যে অর্থপাচার বা অর্থের উৎস লুকানো কিছু সংস্থার নাম উঠে এসেছে। যেমন ইউএইর লাদেসা গালফ হোল্ডিংস এফজেডসি বিশেষভাবে শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিলাসবহুল সম্পত্তির অর্থ লুকিয়ে রাখে।এর জন্য পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকা ও রাজনৈতিকভাবে উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে সংযোগকে দায়ী করে এএমএল নেটওয়ার্ক। এ রকম আরেকটি উচ্চঝুঁকির প্রতিষ্ঠান জিএফএইচ ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ। বাহরাইনভিত্তিক এ ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও অ্যাসেট ম্যানেজার অস্বচ্ছ করপোরেট কাঠামোর কারণে সমালোচিত।

আরও